হংকংয়ের পুঁজিবাজারে রেকর্ড উচ্চতায় চীনা বিনিয়োগ

এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হংকংয়ের শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক পুনরুজ্জীবনে মুখ্য ভূমিকা রাখছে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে আসা বিনিয়োগ।

এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হংকংয়ের শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক পুনরুজ্জীবনে মুখ্য ভূমিকা রাখছে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে আসা বিনিয়োগ। যার কেন্দ্রে রয়েছে মূল ভূখণ্ডের শেয়ারবাজার ও হংকং স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে সংযোগকারী একটি প্রকল্প। স্টক কানেক্ট প্রোগ্রামের শীর্ষক উদ্যোগের আওতায় সম্প্রতি হংকংয়ে চীনা বিনিয়োগ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলেও অনেকে মনে করছেন।

এফটির প্রতিবেদন অনুসারে, স্টক কানেক্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চলটিতে চলতি বছর এ পর্যন্ত প্রায় ৮২০ বিলিয়ন হংকং ডলার বা ১০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে, যা এরই মধ্যে ২০২৪ সালের পুরো বছরের বিনিয়োগপ্রবাহ ৮০৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন হংকং ডলার অতিক্রম করেছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, কভিড-পরবর্তী মন্দা কাটিয়ে হংকংয়ের আর্থিক বাজার পুনরুজ্জীবনে সহায়তা করেছে এসব বিনিয়োগ। একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেয় যে শহরটির ভবিষ্যৎ দিন দিন বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারণ এবং চীনা পুঁজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

চীনের মূল ভূখণ্ডে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিনিয়োগ পরিচালিত হয়। স্টক কানেক্টের কারণে মূল ভূখণ্ডের কড়াকড়ির বাইরে আর্থিক সুযোগ কাজে লাগাতে তৎপরতা দেখাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে চীনে সরকারি বন্ডের ইল্ড রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং শ্লথ প্রবৃদ্ধি ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে দেশটিতে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

বহুজাতিক ব্যাংক বিএনপি পারিবাসের এশিয়া-প্যাসিফিক ইকুইটি অ্যান্ড ডেরিভেটিভ স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান জেসন লুই বলেন, ‘চীনে বিদেশমুখী সুযোগ ব্যবহারে অভ্যন্তরীণ বাজারের বিনিয়োগকারীরা সচেতন হয়ে উঠেছেন। যদি চীনা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হয়ে থাকেন তবে আপনার হাতে আসলে বিকল্প খুব সীমিত—আসলে আপনাকে বাইরে তাকাতেই হবে।’

সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান পিং আন অব চায়না অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের (হংকং) ইকুইটি বিভাগের প্রধান ভিনসেন্ট চের মতে, চীনের মূল ভূখণ্ডে বন্ডের ওপর রিটার্ন খুবই কম। বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে হংকংয়ে চীনা বিনিয়োগকারীদের তহবিল বরাদ্দ করা যৌক্তিক।

স্টক কানেক্ট প্রোগ্রামের সূচনা ২০১৪ সালে। কমপক্ষে ৫ লাখ ইউয়ান বা ৭০ হাজার ডলার হাতে আছে এমন চীনা খুচরা বিনিয়োগকারীরা এ প্রকল্পের আওতায় হংকংয়ের আর্থিক বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ পান। প্রোগ্রামটির আওতায় এ পর্যন্ত হংকংয়ে মোট ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন হংকং ডলার বিনিয়োগ হয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি হয়েছে গত দুই বছরে।

চীনের মূল ভূখণ্ডের বিনিয়োগকারীদের হংকংয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার লেনদেন ‘সাউথবাউন্ড’ হিসেবে পরিচিত। এখন হংকংয়ের প্রধান তালিকাভুক্তি প্লাটফর্মের দৈনিক লেনদেনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এ ধরনের ট্রেডিং, যা ২০১৯ সালে ১০ শতাংশের নিচে ছিল।

স্টক কানেক্টের মাধ্যমে আলিবাবা, বাইদু ও টেনসেন্টের মতো প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনতে পারছেন চীনা বিনিয়োগকারীরা। এ কোম্পানিগুলো চীনের মূল ভূখণ্ডে তালিকাভুক্ত নয়। এ বছর এসব কোম্পানির শেয়ারদর দারুণভাবে বেড়েছে। এতে দুটি বিষয় ভূমিকা রেখেছে। প্রথমটি হলো চীনা স্টার্টআপ ডিপসিকের আলোচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল উন্মোচন। এছাড়া প্রযুক্তি খাত ও চীনা নিয়ন্ত্রকদের মধ্যকার টানাপড়েন কিছুটা কমার ইঙ্গিত বাজার চাঙ্গা করেছে।

এছাড়া বেইজিংয়ের নীতিগত সহায়তা সাম্প্রতিক সময়ে হংকংয়ের বাজারকে আরো চাঙ্গা করেছে। গত জানুয়ারিতে হংকংয়ে এক সম্মেলনে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পান গংশেং জানান, হংকংয়ে আরো বেশি উচ্চমানের প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও বন্ড ইস্যুকে সমর্থন করবে বেইজিং। এছাড়া জাতীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় একটি অংশ হংকংয়ের জন্য বরাদ্দ করা হবে।

অবশ্য হংকং বিষয়ে বেইজিংয়ের প্রতিশ্রুতি বেশ পুরনো। পান গংশেংয়ের ঘোষণার এক বছর আগে চীনের সিকিউরিটিজ রেগুলেটর জানিয়েছিল, তারা হংকং এবং মূল ভূখণ্ডের শেয়ারবাজারগুলোর মধ্যে সংযোগ আরো গভীর করবে এবং চীনা কোম্পানিগুলোকে হংকংয়ে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত করবে। পরিকল্পিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এখন সেই ঘোষণার সুফল পাওয়া যাচ্ছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের। চলতি বছর হংকংয়ে নতুন শেয়ার তালিকাভুক্তির লাইনে থাকা কোম্পানির সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। কারণ মূল ভূখণ্ডের কোম্পানিগুলো দ্বিতীয়বার তালিকাভুক্ত হতে চাইছে।

আইনি সংস্থা ক্লিফোর্ড চান্সের অংশীদার ডেভিড চাই বলেন, ‘হংকং শেয়ারবাজার এখন মূল ভূখণ্ডের কোম্পানিগুলোর জন্য অফশোর মূলধন সংগ্রহের প্রধান প্লাটফর্ম হয়ে উঠেছে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, হংকংয়ের এ পুনরুত্থান বিনিয়োগকারীদের আবার চীনা কোম্পানিগুলোর প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে। এসব চীনা কোম্পানির অনেকগুলো অতীতে সরকারি হস্তক্ষেপ ও রিয়েল এস্টেট খাতের মন্দা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের চায়না ইকুইটি স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান জেমস ওয়াং বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে হংকংয়ে বিনিয়োগ এখন অনেক বেশি ইতিবাচক।’

হংকং ভবিষ্যতে চীনা মূলধনের কেন্দ্র হয়ে উঠছে বলে মনে করেন ড্রু থম্পসন। সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো এবং মার্কিন-চীন সম্পর্ক বিষয়ক এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘হংকং যদি চীনা কোম্পানি ও রেনমিনবি লেনদেনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তবে এটি চীনা অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ব্যাপার। বাকি বিশ্বের যারা চীনের সঙ্গে ব্যবসা করতে চায় তাদের জন্যও ইতিবাচক হবে।’

তবে হংকং বিষয়ে চীনের রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়েও মত রয়েছে ড্রু থম্পসনের। তার মতে, হংকংয়ের এ ঘুরে দাঁড়ানো আসলে চীনের সঙ্গে আরো গভীরভাবে একীভূত হওয়ার ফল। এমন নয় যে অঞ্চলটি বাকি এশিয়ার সঙ্গে বেশি সংযুক্ত হচ্ছে।

আরও